রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কোটেশন (ব্যয় বিবরণী) বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতিমধ্যে ব্যয়ের নথিপত্র চেয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান দুদককে ফাঁকি দিতে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করছেন—বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এই শিক্ষা বোর্ডের দুর্নীতি নিয়ে গত বছরের ৪ নভেম্বর কালের কণ্ঠ ‘টাকা ফুরায়, শেষ হয় না কোটেশন’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে এই দুর্নীতি নিয়ে টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে তদন্তে নামে দুদক। প্রতিবেদনে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত অ্যাপার্টমেন্ট কেনার কথাও উল্লেখ করা হয়।
দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের নতুন ও পুরাতন অফিস সংস্কারে ৪০ লাখ টাকা, রাস্তা নির্মাণে ১৫ লাখ টাকা, কাজীহাটা এলাকায় বোর্ডের পরিত্যক্ত ভবন সংস্কারে ১২ লাখ টাকা, বেলদারপাড়ায় চেয়ারম্যানের বাসভবন সংস্কারে ৪০ লাখ টাকা, বোর্ডের ভেতরে রাস্তা আরসিসিকরণে পাঁচ লাখ টাকা এবং ঢাকায় রেস্ট হাউসে এসি ও ফ্রিজ কেনা সংক্রান্ত দরপত্রের নথি, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, কোটেশনের মাধ্যমে সম্পাদিত সব কাগজপত্রের ফটোকপি ৩ ফ্রেব্রুয়ারির মধ্যে জমা দিতে হবে। দুদক রাজশাহী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠি গত ২৫ জানুয়ারি বোর্ডের চেয়ারম্যানকে দেওয়া হয়। তবে চেয়ারম্যান ফিরতি চিঠিতে কিছুটা সময় চেয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এদিকে বোর্ডের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, কোটেশন বাণিজ্যের মাধ্যমে চেয়ারম্যান বোর্ডের যে অর্থ তছরুপ করেছেন, তার হিসাব তিনি দিতে পারবেন না। এ কারণে দুদকের কাছে সময় আবেদন করেছেন। চেয়ারম্যান দরপত্র ছাড়া কোটেশনের মাধ্যকে কোটি কোটি টাকা তছরুপ করেছেন। এখন সেসব হিসাব-নিকাশের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপ দিচ্ছেন। দুদকের কাছে ভুয়া কাগজপত্র জমা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় চেয়ারম্যান এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাসিয়েছেন।
অন্য একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, শিক্ষা বোর্ডের নিজস্ব জায়গায় নগরীর কাজীহাটায় অবস্থিত বিউটি ভিলাটি অনেক আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। সেই ভবন সংস্কারের নামে লাখ লাখ টাকা অপচয় করা হয়েছে। নিজেকে বাঁচাতে সম্প্রতি সেই ভবনে দুজন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীকে থাকার অনুমতি দিয়েছেন চেয়ারম্যান। ওই দুই কর্মচারী সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করছে। অবৈধভাবে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ মজুরিভিত্তিক কোনো কর্মচারী বোর্ডের সম্পদ ভোগদখল করার এখতিয়ার রাখে না।
সূত্র আরো জানায়, আবুল কালাম যোগদানের পর থেকে ছয়জন কর্মচারীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। তাঁদের বেতন দেওয়া হয় স্টুয়ার্ট শাখা থেকে। কত টাকা বেতন দেওয়া হয়, কিভাবে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটি কেউ জানে না। এটা অনিয়মের মাধ্যমে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এসব অনিয়ম-দুর্নীতিতে তাঁকে নানাভাবে সহায়তা করে থাকেন বোর্ডের নিরাপত্তা কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার। তাঁর মাধ্যমে বোর্ডের সব সংস্কার ও উন্নয়কাজ দরপত্র ছাড়া শুধু কোটেশনের মাধ্যমে করা হয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের নিরাপত্তা কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘আমি শুধু কাজগুলো দেখভাল করি। কোটেশন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার আমার নাই। কাজেই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হওয়ারও সুযোগ নাই।’
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘কোটেশনের নিয়মের মধ্যে থেকেই কিছু কাজ করা হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। ঠিকাদাররা এ কাজ করছেন। আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই। তবে দুদক যেহেতু তদন্ত করছে, আমরা সেই মতো কাগজপত্র দাখিল করব।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নিয়ম লঙ্ঘন করে কাউকে চাকরি দেওয়া হয়নি।’

News Page Below Ad