লোকে তাকে ‘বাইক এম্বুলেন্স দাদা’ বলে ডাকে। এম্বুলেন্স দাদা কি ধরণের নাম! তার কি আর কোনো নাম নেই?

নাম আছে। মানুষটার নাম কারিমুল হক। নামটা আপনার কাছে অপরিচিত কিংবা অখ্যাত হতে পারে। কিন্তু চমক রাখার জন্য আরেকটি তথ্য দেই। এই মানুষটিকে এ বছর ভারত সরকার পদ্মশ্রী পুরষ্কার দিয়ে সম্মানিত করেছে। পদ্মশ্রী ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা। এ বছর ক্রিকেটার বিরাট কোহলি, সংগীত শিল্পী কৈলাস খেরদেরও পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়। কিন্তু কারিমুল হকের মতো নিতান্তই সাধারণ একজন মানুষ কেন পেলেন এই সম্মান?

সমরেশের ডুয়ার্সের চা বাগানের কথা মনে পড়ে? কারিমুল হক সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। তিনি নিজেও চা বাগানে কাজ করেন। বয়স ৫০ পেরিয়ে গিয়েছে। বায়ান্ন চলছে।

পশ্চিমবংগের জলপাইগুড়ি জেলার এই সাধারণ কারিমুল হক অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্পটা চমকপ্রদ। নিজের গ্রামসহ আশেপাশের ২০ গ্রামের আস্থার জায়গা এই ভদ্রলোক। গত ১৪ বছর ধরে তিনি তার মোটরসাইকেলকেই মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন এম্বুলেন্স হিশেবে! কেউ অসুস্থ- এই সংবাদ শুনে কারিমুল সব কিছু রেখে রোগীর কাছে ছুটে যান। তাকে বাইকে করে হাসপাতালে নিয়ে যান। দীর্ঘদিন স্বার্থহীনভাবে এই কাজ করতে করতে এলাকাবাসী তাকে এখন “এম্বুলেন্স দাদা” হিশেবে চেনে।

কীভাবে ভাবনায় এলো এই মোটরসাইকেল কাজে লাগিয়ে এম্বুলেন্স সার্ভিস দেয়ার কথা?

কারিমুল হক যে নিজের মাকেই হারিয়েছেন সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারার ব্যর্থতায়! সেসময় তার এলাকায় এম্বুলেন্স ছিল না। অসুস্থ মাকে হয়তো বাঁচাতে পারতেন এম্বুলেন্স থাকলে, কিন্তু নিয়তি! তার মা মারা গেলেন বিনা চিকিৎসায়। কাছের মানুষ হারানোর যাতনা সেদিন খুব নির্মমভাবেই অনুভব করলেন কারিমুল হক। তাই তিনি নিজের কাছেই শপথ করেন- আর কাউকে অন্তত এম্বুলেন্সের অভাবে বিনা চিকিৎসায় চোখের সামনে মরে যেতে দেবেন না।

নিজের জমানো কষ্টের টাকা দিয়েই একটা মোটরসাইকেল কিনেছিলেন কারিমুল। ১৪ বছর আগের একদিন চা বাগানে তার এক সহকর্মী হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন তাকে নিয়ে মোটরবাইকে করে জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালে পৌঁছে দেন কারিমুল। এভাবেই ধীরে ধীরে তার বাইক-এম্বুলেন্স সার্ভিসের কথা ছড়িয়ে পড়ে।

দিনরাত ২৪ ঘন্টা তিনি এই সার্ভিস দিয়ে থাকেন। সবচেয়ে আনন্দের কথা এই কাজের জন্যে তিনি কোনো অর্থ গ্রহণ করেন না। বিনা পারিশ্রমিকে এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার পাঁচশ’র বেশি রোগীকে বাইক-এম্বুলেন্স সেবা দিয়েছেন!

এছাড়া নিজ বাড়িতে তিনি “ফার্স্ট এইড সেন্টার”-ও শুরু করেছেন। যেখানে তিনি শিশুদের প্রাথমিকভাবে জরুরী চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। মাঝে মধ্যে তিনি স্বাস্থ্য-ক্যাম্প ও পরিচালনা করেন দূর্গম অঞ্চলের বঞ্চিত মানুষদের জন্যে। মাসে মাত্র ৪ হাজার রুপি উপার্জন কারিমুলের। এর অর্ধেকটাই তার খরচ হয় বাইকের তেল আর গরীব রোগীদের ঔষুধ কিনে দেয়ার পেছনে!

কারিমুল হকেরা শুধু মানুষ বাঁচান না, বেঁচে থাকা শিখিয়ে যান মানুষদের। অসুস্থ এই সময়টায় কারিমুল হকের মতো সুস্থ মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম! এই সংখ্যা একদিন বেড়ে যাবে। কারণ, মানুষের ভালবাসা পাওয়ার নেশা বড় নেশা। এই নেশায় পৃথিবী পড়ুক, মৌখিক মানবতার মুখোশ খুলে সত্যিকারের কারিমুলদের জয় হোক!

Save

News Page Below Ad